Chattogram24

Edit Template
Search
Close this search box.
শনিবার, ২রা মার্চ ২০২৪

সাত দাবি নিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস পালন করেছে রোহিঙ্গারা, ফিরতে চাই স্বদেশে

Author picture
স্টাফ রিপোর্টার

কনক বড়ুয়া, নির্বাহী সম্পাদক:

দুই হাজার সতের সালে মিয়ানমার থেকে যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে, তার ৬ বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল ২৫ শে অগাস্ট।

ঐ সময় রাখাইন রাজ্যে হত্যা, গণধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে, ধর্ষণ ও হত্যা করে জাতিগত নিধন অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সে সময় নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। তারা এখনো তাদের জন্মভূমিতে ফিরতে পারেনি।

দুঃখজনক ঐ ঘটনার দিনটিকে কালো দিবস আখ্যা দিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করেছে রোহিঙ্গারা।

শুক্রবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে বর্ষার দিনে বৃষ্টি উপেক্ষা করে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘হোপ ইজ হোম’ ক্যাম্পেইন সমাবেশ পালন করেছেন রোহিঙ্গারা।

শুক্রবার সকাল থেকে গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে ক্যাম্পের বিভিন্ন পয়েন্টে পৃথক পৃথক স্থানে ক্যাম্প থেকে লোকজন নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়। এই দিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত এই ক্যাম্পেইন চলে। ক্যাম্পেইন সমাবেশে পুরুষদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরাও যোগ দেন। এ সময় পোস্টার, প্ল্যাকার্ডে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি তুলেন। সমাবেশে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গারা উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিনে সমাবেশে গিয়ে দেখা যায়- রোহিঙ্গারা ইংরেজিতে লেখা একটি লিফলেট হাতে নিয়ে সমাবেশে দাড়ায়। সেখানে লেখা রয়েছে- আজ, যখন আমরা রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসের ৬ষ্ঠ বার্ষিকী স্মরণে জড়ো হয়েছি, তখন আমাদের সেই ট্র্যাজেডির ক্ষণগুলো খুব বেশি তাড়িত করে চলেছে। এ দিনটি রোহিঙ্গাদের দ্বারা সহ্য করা ক্ষতি, দুর্ভোগ এবং অকল্পনীয় নৃশংসতার বেদনা স্মরণ করিয়ে দেয়।

দুঃখজনক ঐ ঘটনার ষষ্টতম বছরে রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন রোহিঙ্গা নেতা (মাঝি) থেকে শুরু করে সাধারণ রোহিঙ্গারাও। তারমধ্যে রয়েছে- রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার শোয়াইব, মাস্টার নুরুল আমিন, মাস্টার জুবায়ের, মোহাম্মদ ইউসুফ, মাস্টার কামাল, সৈয়দুল আমিন, মাষ্টার মুসা ও সৈয়দ উল্লাহসহ আরো অনেকে।

এসময় রোহিঙ্গারা সেখানে মিয়ানমারে গণহত্যার বিচার, দ্রুত প্রত্যাবাসনসহ ৭টি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো- অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু করা, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল করা, অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে তাদের নিজ গ্রামে পুনর্বাসন করা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা, রাখাইন রাজ্যে আইডিপি ক্যাম্প বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা মিয়ানমারের গ্রামগুলো ও মায়ানমারে নিরপরাধ মানুষের উপর নির্যাতন বন্ধ করা।

সমাবেশে রোহিঙ্গারা বক্তব্যে বলেন- আমরা মায়ানমারের অত্যাচারিত রোহিঙ্গা নাগরিক । মায়ানমার আমাদের মাতৃভূমি হওয়া সত্বেও আমরা যুগ যুগ ধরে মায়ানমার সরকার দ্বারা অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছি। ১৯৭৮ সাল থেকে আমাদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা সহ আমাদের গ্রাম ও ঘরগুলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৮, ১৯৯২, ২০১২, ২০১৬,২০১৭ সালে মায়ানমার সরকার আমাদের উপর একই ধরনের অত্যাচার নিপীড়ন করে আমাদের নিজ দেশ হতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে বিতাড়িত করে।

আরো বলেন- সর্বশেষ ২০১৭ সালে তাদের গণহত্যার মুখে ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা নিজ দেশ মায়ানমার হতে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করি। আমাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং অন্যান্য সমর্থন প্রদানের জন্য জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু, বাংলাদেশ আমাদের দেশ নয়। আমরা আমাদের হোমল্যান্ড মায়ানমারে ফিরে যেতে চাই। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। আমরা কত দিন গৃহহীন থাকব? আমরা আর গৃহহীন থাকতে চাই না। আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা মায়ানমারে আমাদের মাতৃভূমি আরাকানে ফিরে যেতে চাই এবং সঠিক অধিকারের সাথে নাগরিক হিসাবে সেখানে থাকতে চাই।

সমাবেশ শেষে সমাবেশে অংশ নেয়া রোহিঙ্গা নারীদের সাথে কথা বললে তারা জানান- সেদিন চোখের সামনে স্বামীকে হত্যা করার পর আমাদের ওপর জুলুম করে মিয়ানমার সেনারা। আমাদের সেখানে সুখী পরিবার ছিল। পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা ধান ছিল। আমার আগের স্বামী মংডুতে ব্যবসা করত। সেই স্মৃতিময় দিনগুলো আমাদের কাঁদায়। বাংলাদেশ সরকার আমাদের থাকার জায়গা দিয়েছেন। প্রায় ছয় বছর হচ্ছে এখনো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি মিয়ানমারে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। যত দিন আমরা আমাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও পরিবেশ পাব না তত দিন আমরা ফিরে যাব না। সব ঠিক থাকলেই আমরা ফিরে যেতে চাই।

৮ আমর্ড পুলিশের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আমির জাফর (বিপিএম) বলেন, আজ রোহিঙ্গাদের গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে তারা একটি সমাবেশ করেছে। তাদের এই সমাবেশ ঘিরে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সমাবেশে কোন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি।

অন্যদিকে ঘটনার ষষ্ঠতম বছর উপলক্ষ্যে যৌথ এক সংবাদ বিবৃতিতে কক্সবাজার সিএসও এবং এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ইক্যুইটি অ্যান্ড জাস্টিস ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ (ইক্যুইটিবিডি) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর পরিচালিত বর্বর জাতিগত গণহত্যার কঠোর বিচারের দাবি জানিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে ধনী দেশগুলোর দ্বিচারিতার তীব্র নিন্দাও জানানো হয় বিবৃতিতে।